কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫ এ ০৬:০২ PM
কন্টেন্ট: পাতা
ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সংগতি রেখে বাংলাদেশে নগরায়ন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক হিসেব মতে ২০১১ সালে যেখানে নগরাঞ্চলে বসবাস করত জনসংখ্যার শতকরা ২৮ ভাগ, বৃদ্ধি পেয়ে সেখানে তা প্রায় ৩৫% ভাগ। তবে, মহানগর বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌর এলাকা, অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে; আর তা হলো, ভেক্টর বাহিত ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব, যা মশার মাধ্যমে ছ্ড়ায়। শহরে বসবাসরত মানুষের জন্য বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু বড় ধরণের উদ্বেগ এবং হুমকি। এডিস ইজিপ্টি গ্রুপের অন্তর্গত স্ত্রী জাতীয় এডিস মশার দ্বারা ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া বিস্তার লাভ করে । স্ত্রী জাতীয় এডিস মশা প্রজননের সময় মানুষের শরীর থেকে রক্ত গ্রহণ করে থাকে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে রক্ত গ্রহণ করলে ডেঙ্গু ভাইরাস মশার শরীরে প্রবেশ করে। উক্ত মশা কোন ব্যক্তিকে কামড় দিলে ডেঙ্গু ভাইরাস তার শরীরে সংক্রমিত হয়।
এডিস মশা সাধারনতঃ বংশ বৃদ্ধি করে অবহেলিত আবাসন প্রকল্প, পরিত্যক্ত জমি, সেপটিক ট্যাংক, ড্রেন, ছাদের নর্দমা, ভাঙ্গা টব, রাবারের টায়ার এবং অনুরূপ অন্যান্য স্থানে যেখানে বৃষ্টির পানি বা অন্যান্য উৎস থেকে পানিজমে থাকে। এডিস মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তা ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায় । ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশী ছিল ২০২২ ও ২০২৩ সালে। শুধু নগর বা শহর এলাকা নয়, ডেঙ্গু এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে । জুন-জুলাই মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যেত মর্মে সাধারন ধারণা থাকলেও বর্তমানে তা সারা বছরই দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় এবং অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞগণ ডেঙ্গু জ্বরের উচ্চ প্রকোপের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন।
অপরদিকে, মহানগরসমূহের জন্য বর্জ্য নিষ্কাশন, বিশেষ করে মেডিকেল বর্জ্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য কেন্দ্র, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনষ্টিক সেক্টরসমূহ থেকে দৈনিক প্রায় ৫৫ মেট্টিক টন মেডিকেল বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ২০ মেট্টিক টন সংক্রামক বর্জ্য যা শুধু ঢাকা শহরেই। এ সকল সংক্রামক মেডিকেল বর্জ্যের মাত্র অর্ধেক একটি এনজিও বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নিষ্পত্তি করছে । অবশিষ্ট ৩৫ মেট্টিক টন অসংক্রামক মেডিকেল বর্জ্য সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা সংগ্রহপূর্বক সাধারন বর্জ্যের সাথে একত্রিত করে। মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহকারী এবং ময়লা-আবর্জনা পরিস্কারকারীগণ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সূরক্ষার পোশাক পরিধান ব্যতীত এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। অপরদিকে, মেডিকেল বর্জ্যের ভিতর থেকে কেউ কেউ খোলা হাতে পুন: ব্যবহারযোগ্য বা বিক্রয়যোগ্য উপকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যা শুধু তাদের নিজের স্বাস্থ্যের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, আশ-পাশ এবং পরিবেশও দুষিত করে । জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু এবং শব্দ দূষণের ফলে শহরাঞ্চলে মানব স্বাস্থ্যের উপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর অন্যতম হলো অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable Disease) সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ঝুঁকি। এ পরিস্থিতিতে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাগুলি দক্ষতার সাথে ভেক্টর (মশা) ব্যবস্থাপনায় এবং মেডিকেল বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সাথে শহরাঞ্চলে বায়ু ও শব্দ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মানব স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব হ্রাসে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে International Development Association (IDA) থেকে Urban Health, Nutrition and Population প্রকল্পে ঋণ পেয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত। প্রকল্পের ২য় কম্পোনেন্টটি স্থানীয় সরকার বিভাগ Improvement of Urban Public Health Preventive Services নামক প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভেক্টর (মশা) নিয়ন্ত্রণ , আউটহাউজ মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ু ও শব্দ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা প্রচারের জন্য আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগ এবং সচেতনতা তৈরি। এছাড়া অসংক্রমক রোগ (NCD) মোকাবেলায় জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি।
এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বর্ণিত বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাগুলোর দক্ষতা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ঢাকা মহানগরে ডেঙ্গুর ক্রমাগত উচ্চাহার এবং ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, পার্শ্ববর্তী পৌর এলাকা সাভার ও তারাবো এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। এ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পরে ভবিষ্যতে অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভাগুলোতে-এর ফলাফল সম্প্রসারণ করা হবে। প্রকল্পটি মূলতঃ তিনটি সিটি কর্পোরেশন এবং দুটি পৌর এলাকায় পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক পরিষেবা সহায়তা প্রদান করবে নিম্নবর্ণিত উপায়ে:
(১) স্থানীয় সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণসহ সমন্বিত Behavior Change Communication নজরদারি এবং ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিস্তৃত কৌশল উন্নয়ন এবং বাস্তবায়ন (২) নাগরিক জীবনে বায়ু দূষণ এবং শব্দ দূষণসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রভাব হ্রাসকরণে আচরণ পরিবর্তনে প্রচারণা ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা প্রদান (৩) জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বৃক্ষরোপণ (৪) আউট হাউজ মেডিক্যাল বর্জ্য নিস্পত্তির জন্য বর্তমান ব্যবস্থাপনার কৌশল, প্রচলন, গাইডলাইন, নীতি এবং ধরণের পরিবর্তনপূর্বক উন্নয়ন ও তার বাস্তবায়ন।